সাইবার বুলিং কি? মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব - Cyber bullying
![]() |
| সাইবার বুলিং কি |
বর্তমান সময়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া আমাদের জীবনে এনে দিয়েছে অভিনবত্ব। সব ক্ষেত্রেই এনেছে বিপ্লবের ছোঁয়া। সেইসাথে বেড়েছে সাইবার অপরাধ।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা যেমন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, তেমনি নতুন নতুন শব্দের সাথেও আমরা পরিচিত হচ্ছি।
এর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হচ্ছে সাইবার বুলিং ।
সাইবার বুলিং কি?
ইন্টারনেট ভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে উদ্দেশ্যে করে খারাপ মন্তব্য করে তাকে সবার কাছে ছোট / আপমানিত করা, কারো ছবি বা ভিডিওচিত্র বাজে ভাবে উপস্থাপন করা, ইনবক্সে/ক্ষুদেবার্তায় হুমকি কিংবা বাজে ম্যাসেজ দেওয়া,অনুমতি না নিয়ে বারবার বাজে গ্রুপে অ্যাড করা ফেইক আইডি দিয়ে হয়রানি করাই হচ্ছে সাইবার বুলিং।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শৈশবে সাইবার বুলিং এর শিকার হওয়া প্রায় সব কিশোর কিশোরীরা একযোগে আচরণগত এবং মনোসামাজিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। সাইবার বুলিং এর শিকার হওয়া কিশোর কিশোরীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে মানসিক পরিবর্তন ঘটে।
সাইবার বুলিং বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একটি উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের ৫১ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাবহার করেন, এবং তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটে হয়রানির শিকার হয়েছেন । বাংলাদেশ সহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে পরিচালিত একটি সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে ২০১৬ সালের বিবিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দেশগুলিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানির ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এবং নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্করা সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছে। দেশের প্রায় ৩২ শতাংশ শিশুই অনলাইনে ভয়ভীতি,সহিংসতা ও উৎপীড়নের শিকার হয়েছে।দিন দিন এই মাত্রাটা বেড়েই চলেছে।
ন্যান্সি উইলার্ড, সাইবার বুলিং অ্যান্ড সাইবারথ্রেটস: রেসপন্ডিং টু দ্য চ্যালেঞ্জ অফ অনলাইন সোশ্যাল অ্যাগ্রেসন, থ্রেটস অ্যান্ড ডিস্ট্রেস এর লেখক লিখেছেন যে সাইবার বুলিং এর প্রভাব স্কুলের বুলিং এর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হতে পারে কারণ সাইবার বুলিং করা শিশুদের পালানোর সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীরা তাদের হয়রানিকারীকে শনাক্ত করতে পারে না এবং মনে করে, সকলেই তাদের বিরুদ্ধে। আর এর কারণে বুলিং এর শিকার হওয়া ভিকটিমের বিভিন্ন মানসিক সমস্যা দেখা দেয় ।
সাইবার বুলিং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর যেসব প্রভাব ফেলতে পারে -
- ১. বুলিং সম্পর্কে কষ্ট অনুভুত হওয়া।
- ২. হতাশা অনুভূতি বৃদ্ধি ও মেজাজ পরিবর্তন হওয়া।
- ৩. ভয়ের অনুভূতি বেড়ে যাওয়া।
- ৪. আত্মসম্মান বা স্ব-মূল্যবোধের অনুভূতি কমে যাওয়া।
- ৫. রাগ, বিরক্তি বা রাগান্বিত আক্রোশের অনুভূতি বেড়ে যাওয়া, ইত্যাদি।
- ৬. আত্মঘাতী ধারনা বা আত্মহত্যার চেষ্টা।
- ৭. আত্ম-ক্ষতি (যেমন- হাত কাটা, নিজেকে আঘাত করা, মাথায় আঘাত করা ইত্যাদি )।
এইসব সকল মানসিক সমস্যার পেছনে কাজ করে বেশ কিছু হরমোন। যেমনঃ স্ট্রেস হরমোন, ডোপামিন (dopamine), টেস্টোস্টেরন, মেনোপজ । এসব হরমোনের অসংগতির ফলে ব্যক্তির ব্যবহারে পরিবর্তন হয়। উদাহরণস্বরূপ, থাইরয়ড গ্রন্থির অধিক ক্রিয়ার ফলে আক্রান্ত মানুষজন অত্যধিক মানসিক চাপে ভুগতে পারে, অধিক টেস্টোস্টেরন হরমোন ব্যক্তিটিকে বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। সেইসব মানসিক রোগের ক্ষেত্রে হরমোনের ভূমিকাও তুচ্ছ করা যায় না।
নিচে কয়েকটি হরমোনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে:
স্ট্রেস হরমোন: যখনই আমরা মানসিক চাপে থাকি তখনই আমাদের শরীরের বেশ কিছু হরমোন যেমন অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসল এগুলি বেশি মাত্রায় ক্ষরণ হয় এবং সেই থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয় । মানসিক চাপ বাড়তে থাকে এবং এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন বজায় থাকলে, ঝামেলা আরও বৃদ্ধি পায়। স্ট্রেস বাড়লে এইসব হরমোনের ক্ষরণ ক্রমশই বাড়তে থাকে।
ডোপামিন (dopamine): স্কিজোফ্রেনিয়া নামক মানসিক রোগের সৃষ্টি হয় মূলত ডোপামিনের বৃদ্ধির কারনে । অন্যান্য কারণ থাকলেও ডোপামিনের বৃদ্ধিই মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সেজন্য প্রারম্ভিক পর্য্যায়ে ডোপামিনের বৃদ্ধিই যে স্কিজোফ্রেনিয়া রোগের সৃষ্টি করে তা বলা যেতে পারে। অন্যদিকে নেশাযুক্ত দ্রব্যর ব্যবহার সম্বন্ধীয় রোগে ডোপামিনের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
সেরোটোনিন (serotonin): মানসিক সমস্যায় ভুগলে দেহে সোরোটোনিন এর মাত্রা কমে যায়। এর ফলে বিষাদগ্রস্ততা ও মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। বর্তমান প্রায় সবধরনের বিসাদগ্রস্ততার ওষুধ মূলত মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে রোগের লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে।
মেনোপজ: এটি মূলত নারীদের শরীরে ব্যাপক প্রভাব ফেলে ।মেনোপজের পর ভিক্টিম অদ্ভুত সব আচরণ শুরু করে। অবশ্য মেনোপজ শুরু হবার আরও আগে থেকেই পরিবর্তনটা দেখা যায় ।এই স্তরটিকে তাই বলা হয় প্রি-মেনোপজ।
টেস্টোস্টেরন: মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকা ব্যাক্তিরা কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেন, স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে, কোনো কাজে একভাবে মনঃসংযোগ করতে পারেন না, এমনকি অনেকে বিভিন্ন মাত্রার বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন, এটি সাধারণত টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে হয়ে থাকে । ।
সাইবার বুলিং এর প্রভাব স্পষ্টতই খুবই ভয়াবহ।সাইবার বুলিং এর ফলে এই মানসিক পরিবর্তন স্বাভাবিক ভাবেই অনেকের কাছে অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে । মানসিক পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন অর্থাৎ বিভিন্ন হরমোন কম বেশি হতেও দেখা যায় ফলে মানসিক সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে। আর আমাদের সমাজে সাইবার বুলিং এর মাধ্যমে কোন ক্ষতি হওয়ার আগেই সেটি সমাধানে কাজ করতে হবে। সাইবার বুলিং প্রতিরোধ করার মাধ্যমেই আমরা এ ধরণের সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পেতে পারি।
